ঢাকা জেলার সব সাবরেজিস্ট্রি অফিসে দলিল প্রাপ্তি সহজ | নতুন সেবা চালু

1000190453 optimized 500

ঢাকা জেলার সাব-রেজিস্ট্রি অফিসগুলোতে এখন দলিল প্রাপ্তি আগের চেয়ে অনেক সহজ হয়ে গেছে। বছরের পর বছর ধরে যে জটিলতা আর হয়রানিতে পড়তে হতো সাধারণ মানুষকে, সেই সমস্যার সমাধানে নতুন একটি ডিজিটাল সেবা চালু হয়েছে। এখন থেকে জমি রেজিস্ট্রি করার পর দলিল সংগ্রহ করতে বারবার অফিসে যেতে হবে না। মোবাইল ফোনে এসএমএস বা কল পেয়ে জানতে পারবেন কবে আপনার দলিল প্রস্তুত হবে।

২০২৬ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ঢাকা জেলার ২৩টি সাবরেজিস্ট্রি অফিসে এই আধুনিক সেবা চালু হয়েছে। এই নতুন ব্যবস্থায় সময়, অর্থ এবং ভোগান্তি তিনটিই কমবে। আজকের এই আর্টিকেলে আমরা বিস্তারিত জানবো কীভাবে এই নতুন সেবা কাজ করবে এবং এর সুবিধা কী কী।

নতুন সেবা কীভাবে কাজ করবে?

ঢাকা জেলার সাবরেজিস্ট্রার অহিদুল ইসলাম জানিয়েছেন যে এই নতুন পদ্ধতিতে জমি রেজিস্ট্রি সম্পন্ন করার পর সেবাগ্রহীতাদের আর অফিসে ঘুরতে হবে না। রেজিস্ট্রি অফিস থেকে একটি সিলযুক্ত রসিদ দেওয়া হবে যেখানে ক্রেতার মোবাইল নম্বর লেখা থাকবে। দলিল তৈরির কাজ শেষ হলে প্রথমে এসএমএস পাঠানো হবে এবং তারপর প্রয়োজনে সরাসরি ফোন কল দিয়ে জানানো হবে কবে এসে দলিল নিতে হবে।

যারা ব্যক্তিগত কারণে মোবাইল নম্বর দিতে চান না, তাদের জন্যও বিকল্প ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। তারা নির্দিষ্ট হেল্পডেস্ক নম্বরে ফোন করে দলিলের অবস্থা জানতে পারবেন। এই পুরো প্রক্রিয়াটি স্বচ্ছ এবং দ্রুত করার জন্য ডিজিটাল প্রযুক্তির সাহায্য নেওয়া হয়েছে।

দলিল প্রাপ্তির ধাপগুলো

নতুন সেবা ব্যবস্থায় দলিল সংগ্রহের প্রক্রিয়া খুবই সহজ। প্রথমে জমি রেজিস্ট্রি সম্পন্ন করার সময় আপনার মোবাইল নম্বরটি রেজিস্ট্রেশন ফরমে দিতে হবে। এই নম্বরটি ভোটার আইডি নম্বরের নিচে লিখে রাখা হবে। রেজিস্ট্রি শেষ হলে আপনাকে একটি রসিদ দেওয়া হবে যেখানে একটি নির্দিষ্ট তারিখ উল্লেখ থাকবে।

দলিল প্রস্তুত হয়ে গেলে সাব-রেজিস্ট্রি অফিস থেকে আপনার মোবাইলে SMS notification পাঠানো হবে। এসএমএসে জানানো হবে কবে এবং কোন সময়ে এসে দলিল সংগ্রহ করতে হবে। যদি কোনো কারণে এসএমএস না পান, তাহলে সরাসরি ফোন কল করে জানানো হবে। এভাবে আপনার সময় এবং যাতায়াত খরচ দুটোই বাঁচবে।

কোন কোন অফিসে এই সেবা পাওয়া যাবে?

ঢাকা জেলার মোট ২৩টি সাবরেজিস্ট্রি অফিসে এই নতুন সেবা চালু হয়েছে। প্রতিটি অফিসে একজন করে দায়িত্বশীল কর্মকর্তা নিযুক্ত করা হয়েছে যারা সেবাগ্রহীতাদের সাহায্য করবেন। সব কর্মকর্তার নাম, পদবি এবং যোগাযোগ নম্বর একটি তালিকায় সংরক্ষণ করা আছে। এই তথ্য অফিসের নোটিশ বোর্ডে এবং হেল্পডেস্কে পাওয়া যাবে।

ঢাকার যেকোনো এলাকা থেকে রেজিস্ট্রি করুন না কেন, আপনি এই সেবা পাবেন। বিশেষ করে ঢাকা রেজিস্ট্রেশন কমপ্লেক্সে একটি কেন্দ্রীয় হেল্পডেস্ক চালু করা হয়েছে যেখান থেকে যেকোনো তথ্য জানতে পারবেন। সাবরেজিস্ট্রি অফিসগুলো এখন আরও সেবামুখী এবং আধুনিক হয়ে উঠছে।

হেল্পডেস্ক এবং অন্যান্য সুবিধা

শুধু এসএমএস বা কল নয়, ঢাকা জেলার সাবরেজিস্ট্রি অফিসগুলোতে আরও অনেক সুবিধা যুক্ত করা হয়েছে। হেল্পডেস্ক সেবা চালু করা হয়েছে যেখানে প্রশিক্ষিত কর্মী থেকে আপনি সব ধরনের তথ্য জানতে পারবেন। অফিসে এখন বিশুদ্ধ পানির ব্যবস্থা রয়েছে এবং অপেক্ষা করার জন্য সুবিধাজনক বসার জায়গা তৈরি করা হয়েছে।

প্রতি সপ্তাহে অন্তত তিন দিন আকস্মিক পরিদর্শন করা হয় যাতে কোনো অনিয়ম না হয়। নিয়মিত গণশুনানি আয়োজন করা হয় যেখানে সাধারণ মানুষ তাদের অভিযোগ জানাতে পারেন। এসব পদক্ষেপের ফলে সাবরেজিস্ট্রি অফিসের কার্যক্রম এখন আরও স্বচ্ছ ও দায়বদ্ধ হয়েছে।

ভবিষ্যতে কী কী পরিবর্তন আসবে?

বর্তমান সেবা ব্যবস্থা শুধু শুরু মাত্র। ভবিষ্যতে আরও উন্নত সেবা দিতে বেশ কিছু পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। প্রথমত, পুরোনো দলিলগুলো সংরক্ষণের জন্য ভবন সম্প্রসারণ করা হবে। দ্বিতীয়ত, সব দলিল স্ক্যান করে ডিজিটাল ফরম্যাটে সংরক্ষণ করা হবে যাতে ভবিষ্যতে সহজেই খুঁজে পাওয়া যায়।

সবচেয়ে বড় পরিকল্পনা হলো সম্পূর্ণ ডিজিটাল অটোমেশন করা। অর্থাৎ রেজিস্ট্রি থেকে শুরু করে দলিল সংগ্রহ পর্যন্ত পুরো প্রক্রিয়া অনলাইনে করা সম্ভব হবে। এমনকি ঘরে বসেও অনলাইনে দলিলের কপি ডাউনলোড করা যাবে। এই লক্ষ্যে ধাপে ধাপে কাজ চলছে এবং আগামী কয়েক বছরের মধ্যে এটি বাস্তবায়িত হবে বলে আশা করা হচ্ছে।

এই সেবার মূল সুবিধাগুলো

সুবিধা বিস্তারিত
সময় সাশ্রয় বারবার অফিসে যাওয়ার প্রয়োজন নেই, এসএমএস/কল পাবেন
অর্থ সাশ্রয় যাতায়াত খরচ এবং অতিরিক্ত খরচ কমবে
স্বচ্ছতা দলিল প্রস্তুতির সম্পূর্ণ তথ্য জানতে পারবেন
হয়রানি হ্রাস অপ্রয়োজনীয় ভোগান্তি এবং হয়রানি থেকে মুক্তি
ডিজিটাল সেবা আধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে দ্রুত সেবা প্রদান

যোগাযোগের তথ্য এবং প্রয়োজনীয় ডকুমেন্ট

দলিল সংগ্রহের জন্য আপনার কাছে রসিদ এবং জাতীয় পরিচয়পত্র থাকতে হবে। এছাড়া যদি প্রতিনিধি পাঠান, তাহলে পাওয়ার অফ অ্যাটর্নি বা অনুমোদনপত্র লাগবে। হেল্পডেস্কে যোগাযোগ করতে চাইলে ঢাকা রেজিস্ট্রেশন কমপ্লেক্সের অফিসিয়াল নম্বর ব্যবহার করতে পারবেন।

প্রতিটি সাবরেজিস্ট্রি অফিসের আলাদা আলাদা যোগাযোগ নম্বর রয়েছে। এগুলো অফিসের নোটিশ বোর্ডে এবং ওয়েবসাইটে পাওয়া যাবে। যদি কোনো সমস্যা হয়, তাহলে সরাসরি সাবরেজিস্ট্রারের সাথেও কথা বলতে পারবেন। এই নতুন ব্যবস্থায় জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা হয়েছে।

ডিজিটাল বাংলাদেশের নতুন মাইলফলক

ঢাকা জেলার সাবরেজিস্ট্রি অফিসগুলোতে এই নতুন সেবা চালু হওয়া ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার পথে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। সরকার বিভিন্ন সেবায় তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহার করে জনগণের জীবন সহজ করতে চাইছে। জমি রেজিস্ট্রি একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সেবা এবং এতে আধুনিকতা আনা সময়ের দাবি ছিল।

এই উদ্যোগের মাধ্যমে সরকারি অফিসে দুর্নীতি এবং অনিয়ম কমে আসবে। সাধারণ মানুষ তাদের প্রাপ্য সেবা সময়মতো পাবে এবং কোনো অবৈধ লেনদেন করতে হবে না। স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহিতা নিশ্চিত হলে দেশের সামগ্রিক প্রশাসনিক ব্যবস্থা উন্নত হবে।

কেন এই সেবা গুরুত্বপূর্ণ?

জমি রেজিস্ট্রি বাংলাদেশে একটি জটিল প্রক্রিয়া হিসেবে পরিচিত ছিল। অনেক সময় দলিল সংগ্রহ করতে মাসের পর মাস লেগে যেত। মধ্যস্বত্বভোগী এবং দালালদের কবলে পড়ে সাধারণ মানুষ হয়রানির শিকার হতেন। এখন এই নতুন ব্যবস্থায় এসব সমস্যার সমাধান হবে।

বিশেষ করে যারা প্রবাসী বা অন্য জেলায় থাকেন, তাদের জন্য এই সেবা অনেক বড় স্বস্তির। তারা এখন মোবাইলে তথ্য পেয়ে নির্দিষ্ট দিনে এসে দলিল সংগ্রহ করতে পারবেন। প্রতিনিধি পাঠিয়েও কাজ করানো সম্ভব। এভাবে সময়, অর্থ এবং শ্রম তিনটিই সাশ্রয় হবে।

FAQ – প্রায়শই জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন

১. ঢাকা জেলায় দলিল প্রাপ্তির নতুন সেবা কী?

ঢাকা জেলার ২৩টি সাবরেজিস্ট্রি অফিসে এখন দলিল প্রস্তুত হলে এসএমএস এবং ফোন কলের মাধ্যমে সেবাগ্রহীতাদের জানানো হয়। এতে বারবার অফিসে যাওয়ার প্রয়োজন নেই।

২. দলিল সংগ্রহের জন্য কতদিন অপেক্ষা করতে হয়?

সাধারণত রেজিস্ট্রি সম্পন্ন হওয়ার ৭ থেকে ১৫ দিনের মধ্যে দলিল প্রস্তুত হয়ে যায়। এসএমএস বা কলের মাধ্যমে আপনাকে সঠিক তারিখ জানানো হবে।

৩. মোবাইল নম্বর না দিলে কী হবে?

মোবাইল নম্বর দিতে না চাইলে আপনি হেল্পডেস্ক নম্বরে ফোন করে বা সরাসরি অফিসে যোগাযোগ করে দলিলের অবস্থা জানতে পারবেন। বিকল্প ব্যবস্থা রাখা আছে।

৪. কোন কোন ডকুমেন্ট লাগবে দলিল নিতে?

দলিল সংগ্রহের জন্য রসিদ, জাতীয় পরিচয়পত্র এবং প্রয়োজনে পাওয়ার অফ অ্যাটর্নি লাগবে। সব কাগজপত্র সঠিক থাকলে দ্রুত দলিল পাবেন।

৫. ভবিষ্যতে কি অনলাইনে দলিল পাওয়া যাবে?

হ্যাঁ, ভবিষ্যতে সম্পূর্ণ ডিজিটাল অটোমেশন করা হবে। তখন ঘরে বসেই অনলাইনে দলিলের কপি ডাউনলোড করা সম্ভব হবে।

৬. ঢাকার বাইরে কি এই সেবা পাওয়া যায়?

বর্তমানে এই সেবা শুধু ঢাকা জেলার ২৩টি সাবরেজিস্ট্রি অফিসে চালু আছে। তবে ভবিষ্যতে সারাদেশে সম্প্রসারণ করা হবে বলে জানানো হয়েছে।

৭. হেল্পডেস্ক কোথায় পাওয়া যাবে?

ঢাকা রেজিস্ট্রেশন কমপ্লেক্সে কেন্দ্রীয় হেল্পডেস্ক রয়েছে। এছাড়া প্রতিটি সাবরেজিস্ট্রি অফিসে আলাদা হেল্পডেস্ক সেবা চালু করা হয়েছে।

৮. সেবা নিয়ে অভিযোগ করতে চাইলে কী করব?

নিয়মিত গণশুনানি আয়োজন করা হয়। এছাড়া সরাসরি সাবরেজিস্ট্রারের সাথে যোগাযোগ করতে পারবেন অথবা অনলাইন পোর্টালে অভিযোগ জমা দিতে পারবেন।

উপসংহার

ঢাকা জেলার সাবরেজিস্ট্রি অফিসগুলোতে চালু হওয়া এই নতুন দলিল প্রাপ্তি সেবা সত্যিকার অর্থে একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ। এসএমএস, ফোন কল এবং হেল্পডেস্কের মাধ্যমে সেবা প্রদানের এই আধুনিক ব্যবস্থা সাধারণ মানুষের সময়, অর্থ এবং কষ্ট তিনটিই বাঁচাবে। ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্ন বাস্তবায়নে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক।

ভবিষ্যতে যখন সম্পূর্ণ ডিজিটাল অটোমেশন হবে, তখন ঘরে বসেই সব কাজ সম্পন্ন করা যাবে। পুরো প্রক্রিয়া হবে স্বচ্ছ, দ্রুত এবং নির্ভরযোগ্য। সরকারের এই উদ্যোগ প্রশংসনীয় এবং অন্যান্য জেলায়ও এই সেবা সম্প্রসারণ করা উচিত। জমি রেজিস্ট্রি এবং দলিল সংগ্রহের মতো জটিল কাজ এখন হবে সহজ, সবার জন্য।

Similar Posts

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *