জিভে ঘা হলে কী করবেন? কারণ, লক্ষণ ও কার্যকর চিকিৎসা গাইড

1000190839 Picsart .jpg 1

জিভে ঘা হলে কী করবেন? সম্পূর্ণ চিকিৎসা গাইড

জিভে ঘা হওয়া একটি অত্যন্ত সাধারণ কিন্তু বেদনাদায়ক সমস্যা যা আমাদের দৈনন্দিন জীবনযাত্রাকে মারাত্মকভাবে ব্যাহত করতে পারে। একটু ঝাল খাবার খেলেই চোখে পানি এসে যায়, গরম চা পান করতে গেলে জ্বালায় শ্বাস বন্ধ হয়ে আসে, এমনকি স্বাভাবিক কথা বলতেও প্রচণ্ড অসুবিধা হয়। অনেকেই মনে করেন এটি এমনিতেই সেরে যাবে, আবার কেউ কেউ ভয় পেয়ে যান যে এটি কোনো মারাত্মক রোগের লক্ষণ কিনা। আসলে জিভের ঘা (tongue ulcer) বেশিরভাগ ক্ষেত্রে ক্ষতিকর নয়, তবে সঠিক যত্ন এবং চিকিৎসা না নিলে এটি দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে এবং জটিলতা সৃষ্টি করতে পারে।

এই আর্টিকেলে আমরা বিস্তারিত আলোচনা করব জিভে ঘা কেন হয়, এর লক্ষণ, কার্যকর চিকিৎসা পদ্ধতি, ঘরোয়া প্রতিকার, কোন ওষুধ ব্যবহার করা যায়, এবং কখন ডাক্তারের পরামর্শ নেওয়া অত্যাবশ্যক। এই গাইডটি সম্পূর্ণভাবে বৈজ্ঞানিক তথ্য এবং চিকিৎসা বিশেষজ্ঞদের পরামর্শের উপর ভিত্তি করে তৈরি করা হয়েছে।

জিভে ঘা আসলে কী এবং এটি কীভাবে চেনা যায়?

জিভের ঘা (tongue sore) মূলত মুখের ভেতরের নরম টিস্যুতে সৃষ্ট একটি খোলা ক্ষত বা আলসার (ulcer)। এটি সাধারণত ছোট আকারে শুরু হয় এবং প্রথমে জিভে হালকা জ্বালাপোড়া অনুভূত হয়। ধীরে ধীরে সেই স্থানে একটি সাদা বা হলুদ রঙের গোলাকার বা ডিম্বাকৃতির দাগ দেখা যায়, যার চারপাশ সাধারণত লালচে হয়ে থাকে। জিভের যেকোনো অংশে এই ঘা হতে পারে—জিভের ডগায়, পাশে, নিচের অংশে বা এমনকি জিভের পিছনের দিকেও।

শুরুর দিকে অনেকেই এই সমস্যাকে গুরুত্ব দেন না, কিন্তু ১-২ দিন পর যখন ব্যথা তীব্র হয়ে ওঠে এবং খাবার গ্রহণ বা কথা বলায় সমস্যা শুরু হয়, তখন বুঝতে পারেন বিষয়টি কতটা যন্ত্রণাদায়ক। সাধারণত এই ঘা ৭ থেকে ১৪ দিনের মধ্যে নিজে নিজেই সেরে যায়, তবে কিছু ক্ষেত্রে এটি বারবার ফিরে আসতে পারে বা দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে।

জিভে ঘা হওয়ার প্রধান কারণসমূহ

জিভে ঘা হওয়ার পেছনে একাধিক কারণ দায়ী থাকতে পারে। অনেক সময় একটি নয়, বরং একাধিক কারণ একসাথে কাজ করে এই সমস্যা সৃষ্টি করে। নিচে সবচেয়ে সাধারণ এবং গুরুত্বপূর্ণ কারণগুলো বিস্তারিতভাবে ব্যাখ্যা করা হলো।

মুখের ভেতরে আঘাত: খুব গরম খাবার বা পানীয় পান করার ফলে জিভ পুড়ে যাওয়া, ভুলবশত জিভে কামড় দেওয়া, অথবা দাঁতের ধারালো বা ভাঙা অংশে বারবার ঘষা লাগা থেকে সহজেই tongue injury হতে পারে এবং সেখান থেকে ঘা সৃষ্টি হতে পারে। এছাড়া শক্ত ব্রাশ ব্যবহার করে জিভ পরিষ্কার করলেও ক্ষত হতে পারে।

ভিটামিন ও মিনারেলের ঘাটতি: শরীরে ভিটামিন বি১২ (Vitamin B12), ভিটামিন বি কমপ্লেক্স, ফলিক অ্যাসিড (Folic Acid), আয়রন (Iron) বা জিঙ্ক (Zinc) এর ঘাটতি থাকলে জিভে ঘা হওয়ার সম্ভাবনা বহুগুণ বেড়ে যায়। বিশেষ করে যারা সুষম খাদ্য গ্রহণ করেন না, পর্যাপ্ত শাকসবজি, ফলমূল বা প্রোটিন জাতীয় খাবার খান না, তাদের মধ্যে এই সমস্যা বেশি দেখা যায়।

পেটের সমস্যা ও অ্যাসিডিটি: গ্যাস্ট্রিক (gastric), বদহজম, কোষ্ঠকাঠিন্য বা অতিরিক্ত অ্যাসিডিটি (acidity) থাকলে তার সরাসরি প্রভাব মুখগহ্বরে পড়ে এবং জিভে ঘা হতে পারে। অনেকেই বলে থাকেন, “পেট খারাপ হলেই আমার মুখে ঘা হয়”—এটি একদম বাস্তব এবং চিকিৎসা বিজ্ঞানসম্মত।

মানসিক চাপ ও ঘুমের অভাব: অতিরিক্ত স্ট্রেস (stress), দুশ্চিন্তা, কাজের চাপ বা পর্যাপ্ত ঘুম না হলে শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা (immunity) কমে যায়। ফলে ছোটখাটো সমস্যাও বড় আকার ধারণ করে, এবং mouth ulcer তার একটি উদাহরণ।

ধূমপান ও তামাক সেবন: সিগারেট, জর্দা, গুল বা পান খাওয়ার ফলে মুখের ভেতরের নরম ত্বক মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং জিভে ঘা হওয়ার ঝুঁকি অনেক বেড়ে যায়। দীর্ঘমেয়াদে এটি oral cancer এর ঝুঁকিও বাড়ায়।

এলার্জি ও সংক্রমণ: কিছু নির্দিষ্ট খাবার বা ওষুধের প্রতি এলার্জি (allergy), ভাইরাল বা ব্যাকটেরিয়াল সংক্রমণ (infection), এমনকি ফাংগাল ইনফেকশন (oral thrush) থেকেও জিভে ঘা হতে পারে।

কারণ বর্ণনা প্রতিরোধ
আঘাত গরম খাবার, কামড়, দাঁতের ঘষা সাবধানে খাবার খান, দাঁতের চিকিৎসা করান
ভিটামিন ঘাটতি B12, Iron, Folic Acid এর অভাব সুষম খাবার খান, প্রয়োজনে supplement নিন
অ্যাসিডিটি পেটের সমস্যা, গ্যাস্ট্রিক তেল-মসলা কম খান, সময়মতো খান
স্ট্রেস মানসিক চাপ, ঘুমের অভাব পর্যাপ্ত বিশ্রাম নিন, stress management করুন
ধূমপান তামাক, সিগারেট, পান সম্পূর্ণরূপে বর্জন করুন

জিভে ঘা হলে যেসব লক্ষণ দেখা যায়

জিভে ঘা হলে শুধুমাত্র একটি দাগ দেখা যায় না, বরং কিছু সুনির্দিষ্ট লক্ষণ (symptoms) প্রকাশ পায় যা থেকে সহজেই বোঝা যায় যে এটি সাধারণ ঘা নাকি আরও গুরুতর কিছু।

প্রথমে জিভে হালকা খচখচে অনুভূতি বা জ্বালাপোড়া শুরু হয়। এরপর সেখানে ছোট সাদা বা হলুদাভ রঙের একটি বা একাধিক দাগ দেখা যায়, যার চারপাশ লালচে হয়ে থাকে। ঝাল, টক, নোনতা বা গরম কিছু খেলেই তীব্র ব্যথা অনুভূত হয়। অনেক সময় কথা বললে, জিভ নাড়াচাড়া করলে বা এমনকি লালা গিলতে গেলেও অস্বস্তি হয়। কিছু ক্ষেত্রে মুখে দুর্গন্ধ, অতিরিক্ত লালা নিঃসরণ, খাবারের স্বাদ না পাওয়া, এমনকি হালকা জ্বর বা শরীর ম্যাজম্যাজও দেখা দিতে পারে।

যদি এই লক্ষণগুলো দুই সপ্তাহের বেশি সময় ধরে স্থায়ী হয়, ঘা আকারে বাড়তে থাকে, অথবা রক্তপাত হয়, তাহলে অবশ্যই দ্রুত ডাক্তারের পরামর্শ নেওয়া উচিত।

জিভে ঘা হলে তাৎক্ষণিক করণীয়

জিভে ঘা উঠেছে বুঝতে পারার পরপরই কিছু সহজ পদক্ষেপ নিলে ব্যথা এবং অস্বস্তি অনেকটাই কমে যায় এবং ঘা দ্রুত সারতে শুরু করে।

প্রথমেই দিনে কমপক্ষে ২-৩ বার কুসুম গরম পানিতে লবণ মিশিয়ে কুলকুচি (gargle) করুন। এটি মুখের জীবাণু কমায় এবং ঘা পরিষ্কার রাখতে সাহায্য করে। মুখ এবং জিভ সবসময় পরিষ্কার রাখুন, তবে শক্ত ব্রাশ দিয়ে ঘষবেন না। ঝাল, টক, অতিরিক্ত নোনতা এবং গরম খাবার সম্পূর্ণভাবে এড়িয়ে চলুন কারণ এগুলো ঘায়ে তীব্র জ্বালা সৃষ্টি করে। পর্যাপ্ত পরিমাণে পানি পান করুন এবং মুখ শুকনো রাখবেন না। ধূমপান ও তামাকজাত দ্রব্য সম্পূর্ণরূপে পরিহার করুন। নরম এবং ঠান্ডা খাবার যেমন দই, কলা, ঠান্ডা দুধ, স্যুপ খেতে পারেন যা জিভে প্রশান্তি দেয়।

জিভে ঘা হলে কার্যকর ঘরোয়া চিকিৎসা

ঘরোয়া কিছু প্রাকৃতিক উপাদান আছে যা যুগ যুগ ধরে জিভের ঘা সারাতে ব্যবহৃত হয়ে আসছে এবং এখনো অত্যন্ত কার্যকর। এগুলো সহজলভ্য, সস্তা এবং কোনো পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া নেই।

মধু (Honey): মধু একটি প্রাকৃতিক অ্যান্টিব্যাকটেরিয়াল এবং অ্যান্টিসেপটিক উপাদান। দিনে ২-৩ বার সরাসরি ঘায়ে খাঁটি মধু লাগালে ব্যথা কমে, জ্বালা প্রশান্ত হয় এবং ঘা দ্রুত শুকিয়ে যায়। মধু ঘায়ের উপর একটি প্রতিরক্ষামূলক স্তর তৈরি করে এবং সংক্রমণ রোধ করে।

নারকেল তেল (Coconut Oil): নারকেল তেলে শক্তিশালী প্রদাহনাশক (anti-inflammatory) গুণ রয়েছে। সকালে এবং রাতে ঘুমানোর আগে জিভের ঘায়ে অল্প পরিমাণ নারকেল তেল লাগিয়ে রাখলে জ্বালা কমে এবং ক্ষত দ্রুত নিরাময় হয়।

টক দই ও ঠান্ডা দুধ: টক দই এবং ঠান্ডা দুধে প্রোবায়োটিক থাকে যা মুখের সুস্থ ব্যাকটেরিয়া বৃদ্ধিতে সাহায্য করে এবং অ্যাসিডিটি কমায়। দিনে ২-৩ বার টক দই বা ঠান্ডা দুধ খেলে জিভে প্রশান্তি অনুভূত হয় এবং ঘা দ্রুত সারে।

তুলসী পাতা (Tulsi): তুলসী পাতার রস বা তাজা পাতা চিবিয়ে খেলে মুখের জীবাণু ধ্বংস হয় এবং ঘা সারতে সাহায্য করে। তুলসীতে অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল গুণ রয়েছে যা সংক্রমণ প্রতিরোধ করে।

অ্যালোভেরা জেল (Aloe Vera): তাজা অ্যালোভেরা জেল ঘায়ে লাগালে জ্বালাপোড়া এবং ব্যথা দ্রুত কমে। এটি শীতল প্রভাব ফেলে এবং ক্ষত নিরাময়ে সাহায্য করে।

বেকিং সোডা (Baking Soda): এক চা-চামচ বেকিং সোডা অল্প পানিতে মিশিয়ে পেস্ট তৈরি করে ঘায়ে লাগালে pH balance ঠিক হয় এবং ব্যথা কমে।

জিভে ঘা হলে কী কী ওষুধ ব্যবহার করা যায়?

যদি ঘরোয়া উপায়ে ২-৩ দিনেও উন্নতি না হয়, তাহলে কিছু ওষুধ (medicine) ব্যবহার করা যেতে পারে। তবে দীর্ঘদিন ধরে বা বারবার ঘা হলে অবশ্যই ডাক্তারের পরামর্শ নেওয়া উচিত।

ওষুধের ধরন নাম ব্যবহার
ভিটামিন সাপ্লিমেন্ট Vitamin B-Complex, B12 (Mecobalamin), Folic Acid, Iron, Zinc শরীরে ভিটামিনের ঘাটতি পূরণ করে
ব্যথা কমানোর জেল Benzocaine Oral Gel, Choline Salicylate Gel, Lignocaine Gel সরাসরি ঘায়ে লাগিয়ে ব্যথা ও জ্বালা কমায়
মাউথওয়াশ Chlorhexidine Mouthwash, Povidone Iodine Gargle, Benzydamine Mouthwash মুখের জীবাণু কমায়, ঘা পরিষ্কার রাখে
অ্যাসিডিটির ওষুধ Omeprazole, Esomeprazole, Antacid Syrup, Ranitidine পেটের সমস্যা ও অ্যাসিডিটি কমায়
ইমিউনিটি বুস্টার Vitamin C, Multivitamin Syrup, Probiotic Capsule রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়

গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতা: যদি জিভের ঘা ১৪ দিনের বেশি সময় ধরে থাকে, ঘা আকারে বড় হয়, রক্তপাত হয়, শক্ত বা কালচে হয়ে যায়, অথবা বারবার ফিরে আসে—তাহলে নিজে নিজে ওষুধ না খেয়ে অবশ্যই একজন বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের পরামর্শ নিন। কারণ দীর্ঘস্থায়ী জিভের ঘা কখনো কখনো গুরুতর রোগের লক্ষণ হতে পারে।

জিভে ঘা হলে কোন খাবার খাবেন এবং কোনগুলো এড়িয়ে চলবেন?

জিভে ঘা থাকা অবস্থায় খাদ্য তালিকায় বিশেষ মনোযোগ দেওয়া অত্যন্ত জরুরি। কিছু খাবার ঘা সারাতে সাহায্য করে, আবার কিছু খাবার ব্যথা বাড়িয়ে দেয় এবং নিরাময় প্রক্রিয়া বিলম্বিত করে।

যেসব খাবার খাবেন: নরম এবং ঠান্ডা খাবার যেমন টক দই, ঠান্ডা দুধ, কলা, পাকা পেঁপে, সিদ্ধ আলু, নরম ভাত, স্যুপ, ডালের পানি, ওটমিল খেতে পারেন। ভিটামিন বি১২ সমৃদ্ধ খাবার যেমন মাছ, মাংস, ডিম, দুধ খান। ভিটামিন সি যুক্ত ফল যেমন পেয়ারা, আমলকী, কমলালেবু (যদি টক সহ্য হয়), সবুজ শাকসবজি, পালংশাক, ব্রোকলি নিয়মিত খান। পর্যাপ্ত পানি পান করুন এবং ডাবের পানি, তরমুজের রস খেতে পারেন।

যেসব খাবার এড়িয়ে চলবেন: ঝাল খাবার যেমন মরিচ, গোলমরিচ, ঝাল তরকারি, টক খাবার যেমন আচার, টক ফল (লেবু, কাঁচা আম), অতিরিক্ত নোনতা খাবার, গরম খাবার ও পানীয়, ভাজাপোড়া ও তৈলাক্ত খাবার, শক্ত বা খসখসে খাবার যেমন চিপস, বিস্কুট, টোস্ট, অ্যালকোহল এবং ক্যাফেইন জাতীয় পানীয় সম্পূর্ণভাবে এড়িয়ে চলুন।

কখন অবশ্যই ডাক্তারের কাছে যাবেন?

সব জিভের ঘা যে সাধারণ এবং নিজে নিজে সেরে যাবে, তা নয়। কিছু নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে দেরি না করে অবশ্যই একজন ডেন্টিস্ট বা ENT বিশেষজ্ঞের শরণাপন্ন হওয়া জরুরি।

যদি ঘা দুই সপ্তাহের বেশি সময় ধরে না সারে, যদি ঘা থেকে রক্তপাত হয়, যদি ঘা শক্ত বা কালচে হয়ে যায়, যদি ঘা আকারে বড় হতে থাকে (১ সেমি বা তার বেশি), যদি একসাথে একাধিক ঘা দেখা দেয়, যদি ওজন কমে যাওয়া, দীর্ঘদিন জ্বর, অতিরিক্ত দুর্বলতা, গলার লিম্ফ নোড ফুলে যাওয়া, বা খাবার গিলতে কষ্ট হওয়ার মতো উপসর্গ দেখা দেয়—তাহলে অবশ্যই দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।

খুব কম সংখ্যক ক্ষেত্রে হলেও, দীর্ঘস্থায়ী এবং না সারা জিভের ঘা কখনো কখনো টিউমার বা ক্যান্সারের প্রাথমিক লক্ষণ হতে পারে। তাই সতর্ক থাকা এবং সঠিক সময়ে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

জিভে ঘা প্রতিরোধে দৈনন্দিন অভ্যাস ও জীবনযাত্রা

জিভে ঘা বারবার হলে বুঝতে হবে যে কোথাও না কোথাও দৈনন্দিন জীবনযাত্রায় সমস্যা রয়েছে। কিছু সহজ প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা (prevention) অনুসরণ করলে এই সমস্যা অনেকাংশে এড়ানো সম্ভব।

সুষম খাবার খান এবং খাদ্য তালিকায় নিয়মিত ফল, শাকসবজি, প্রোটিন জাতীয় খাবার রাখুন। পর্যাপ্ত পানি পান করুন, দিনে কমপক্ষে ৮-১০ গ্লাস পানি পান করা উচিত। মানসিক চাপ কমানোর চেষ্টা করুন, প্রয়োজনে মেডিটেশন বা যোগব্যায়াম করতে পারেন। প্রতিদিন ৭-৮ ঘন্টা পর্যাপ্ত ঘুমান। মুখের পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখুন, দিনে দুইবার দাঁত ব্রাশ করুন এবং নরম ব্রাশ ব্যবহার করুন। দাঁতের কোনো সমস্যা যেমন ধারালো বা ভাঙা দাঁত, ক্যাভিটি থাকলে দ্রুত ডেন্টাল চেকআপ করান। ধূমপান ও তামাক সেবন সম্পূর্ণভাবে বন্ধ করুন। যদি আপনার ভিটামিনের ঘাটতি থাকে, তাহলে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী নিয়মিত সাপ্লিমেন্ট গ্রহণ করুন।

উপসংহার: সচেতন থাকুন, সুস্থ থাকুন

জিভে ঘা একটি সাধারণ সমস্যা হলেও এটি আমাদের দৈনন্দিন জীবনের স্বাচ্ছন্দ্য কেড়ে নিতে পারে। ভালো খবর হলো—সঠিক যত্ন, ঘরোয়া প্রতিকার, স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস এবং প্রয়োজনে চিকিৎসকের পরামর্শ নিলে এই সমস্যা খুব সহজেই নিয়ন্ত্রণে রাখা যায় এবং দ্রুত সমাধান পাওয়া যায়।

নিজের শরীরের সংকেতগুলো বুঝুন, ছোট সমস্যাকে অবহেলা করবেন না, আবার অযথা আতঙ্কিতও হবেন না। সচেতনতাই প্রতিরোধের প্রথম ধাপ। স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন করুন, সুষম খাবার খান, মানসিক চাপ কমান এবং নিয়মিত চেকআপ করান—তাহলেই থাকতে পারবেন সুস্থ ও সুন্দর।

প্রায়শই জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন (FAQ)

১. জিভে ঘা কি ছোঁয়াচে রোগ?

না, সাধারণ মুখের ঘা (mouth ulcer) ছোঁয়াচে নয় এবং এটি এক ব্যক্তি থেকে অন্য ব্যক্তিতে ছড়ায় না। তবে যদি ঘা কোনো ভাইরাল সংক্রমণ (যেমন হারপিস) থেকে হয়, তাহলে সেটি ছোঁয়াচে হতে পারে।

২. জিভে ঘা সাধারণত কতদিনে সেরে যায়?

সাধারণত জিভের ঘা ৭ থেকে ১৪ দিনের মধ্যে নিজে নিজেই সেরে যায়। তবে যদি সঠিক যত্ন নেওয়া না হয় বা অন্য কোনো সমস্যা থাকে, তাহলে এটি দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে।

৩. বারবার জিভে ঘা হওয়া কি স্বাভাবিক?

না, বারবার জিভে ঘা হওয়া স্বাভাবিক নয়। এটি শরীরে ভিটামিনের ঘাটতি (বিশেষত B12, Iron), রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যাওয়া, দীর্ঘমেয়াদী পেটের সমস্যা, বা অন্য কোনো স্বাস্থ্য সমস্যার ইঙ্গিত হতে পারে। এক্ষেত্রে অবশ্যই ডাক্তারের পরামর্শ নিন এবং প্রয়োজনীয় রক্ত পরীক্ষা করান।

৪. শিশুদের জিভে ঘা হলে কী করবেন?

শিশুদের জিভে ঘা হলে প্রথমে ঝাল, টক এবং গরম খাবার সম্পূর্ণ বন্ধ করুন। নরম এবং ঠান্ডা খাবার যেমন দই, দুধ, কলা, খিচুড়ি দিন। হালকা গরম পানিতে সামান্য লবণ মিশিয়ে মুখ ধুয়ে দিন। যদি শিশুর ব্যথা বেশি হয় বা খেতে না পারে, তাহলে দ্রুত শিশু বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিন। নিজে নিজে কোনো ওষুধ দেবেন না।

৫. জিভে ঘা কি ক্যান্সারের লক্ষণ হতে পারে?

বেশিরভাগ ক্ষেত্রে জিভের ঘা সাধারণ এবং ক্যান্সার (oral cancer) এর লক্ষণ নয়। তবে যদি ঘা তিন সপ্তাহের বেশি সময় ধরে না সারে, শক্ত হয়ে যায়, কালো বা লালচে হয়, রক্তপাত হয়, অথবা ব্যথাহীন কিন্তু বড় আকারের হয়—তাহলে অবশ্যই দ্রুত বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের কাছে যান এবং বায়োপসি (biopsy) করান। প্রাথমিক পর্যায়ে নির্ণয় হলে চিকিৎসা সহজ এবং কার্যকর।

৬. জিভে ঘা হলে কি মাউথওয়াশ ব্যবহার করা যায়?

হ্যাঁ, তবে অ্যালকোহলমুক্ত মাউথওয়াশ ব্যবহার করুন। Chlorhexidine বা Benzydamine মাউথওয়াশ জিভের ঘায়ে বিশেষভাবে কার্যকর। তবে খুব বেশিবার বা দীর্ঘদিন ধরে মাউথওয়াশ ব্যবহার করবেন না, এতে মুখের স্বাভাবিক ব্যাকটেরিয়া নষ্ট হতে পারে।

৭. জিভে ঘা হলে কি দাঁত ব্রাশ করা উচিত?

হ্যাঁ, অবশ্যই দাঁত ব্রাশ করুন তবে নরম ব্রাশ ব্যবহার করুন এবং ঘায়ে সরাসরি ঘষবেন না। মুখের পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা অত্যন্ত জরুরি, কারণ এটি ঘা সংক্রমিত হওয়া থেকে রক্ষা করে। ব্রাশ করার পর হালকা অ্যান্টিসেপটিক মাউথওয়াশ দিয়ে কুলকুচি করতে পারেন।

৮. গর্ভবতী অবস্থায় জিভে ঘা হলে কী করবেন?

গর্ভবতী মহিলাদের জিভে ঘা হলে প্রথমে ঘরোয়া উপায় (মধু, নারকেল তেল, লবণ পানি দিয়ে কুলকুচি) চেষ্টা করুন। কোনো ওষুধ নেওয়ার আগে অবশ্যই গাইনোকোলজিস্ট বা ডাক্তারের পরামর্শ নিন, কারণ কিছু ওষুধ গর্ভাবস্থায় ব্যবহার করা নিরাপদ নয়।

এই আর্টিকেলটি শুধুমাত্র তথ্যমূলক উদ্দেশ্যে প্রকাশিত। এটি চিকিৎসকের পরামর্শ, রোগ নির্ণয় বা চিকিৎসার বিকল্প নয়। যেকোনো স্বাস্থ্য সমস্যার জন্য অবশ্যই যোগ্য চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।

Similar Posts

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *