কেন শিশুদের রাস্তার নিয়ম শেখানো এত গুরুত্বপূর্ণ?
শিশুরা স্বভাবতই কৌতূহলী এবং অসচেতন। তারা রাস্তার বিপদ সম্পর্কে প্রাপ্তবয়স্কদের মতো সচেতন নয়। গবেষণায় দেখা গেছে, ৫ থেকে ১৪ বছর বয়সী শিশুরা রোড ট্রাফিক ইনজুরিতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। কারণ এই বয়সে তারা একা রাস্তায় চলাফেরা শুরু করে, কিন্তু সঠিক সেফটি রুলস না জানার কারণে দুর্ঘটনার শিকার হয়। ইউনিসেফ (UNICEF) এবং গ্লোবাল রোড সেফটি পার্টনারশিপ-এর মতো আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো বারবার জোর দিচ্ছে যে, ছোটবেলা থেকেই ট্রাফিক এডুকেশন দিলে ভবিষ্যতে দুর্ঘটনার হার উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব।
এছাড়াও, শিশুদের রিঅ্যাকশন টাইম প্রাপ্তবয়স্কদের তুলনায় কম থাকে, এবং তারা গতি ও দূরত্ব সঠিকভাবে পরিমাপ করতে পারে না। এই কারণেই তাদের জন্য পেডেস্ট্রিয়ান সেফটি এবং রোড ক্রসিং রুলস শেখানো অত্যন্ত জরুরি। যত আগে শেখানো শুরু করবেন, তত বেশি তারা এটি স্বাভাবিক অভ্যাস হিসেবে গ্রহণ করবে।
বয়স অনুযায়ী শিশুকে রাস্তার নিয়ম শেখানোর সঠিক পদ্ধতি
শিশুদের মানসিক বিকাশ এবং বোঝার ক্ষমতা বয়সের সাথে পরিবর্তিত হয়। তাই প্রতিটি বয়সের জন্য আলাদা আলাদা রোড সেফটি টিপস প্রয়োগ করা উচিত। নিচে একটি এজ-ওয়াইজ গাইডলাইন দেওয়া হলো যা অনুসরণ করলে আপনার সন্তান সঠিকভাবে রাস্তার নিয়ম শিখবে।
৩-৫ বছর বয়স: পর্যবেক্ষণ ও নিরাপদ অভ্যাস তৈরির সময়
এই বয়সের শিশুরা একেবারেই ছোট এবং রাস্তার ঝুঁকি বুঝতে অক্ষম। তবে এই সময়টাই হলো সেফ হ্যাবিটস তৈরির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়। এই বয়সে শিশুরা অনুকরণের মাধ্যমে শেখে—অর্থাৎ আপনি যা করবেন, তারা সেটাই অনুসরণ করবে। তাই আপনার নিজের রোড ডিসিপ্লিন মেনে চলা অত্যন্ত জরুরি। এই বয়সে শিশুদের শেখানোর মূল বিষয়গুলো হলো—সবসময় অভিভাবকের হাত ধরে রাস্তা পার হওয়া, ফুটপাতে হাঁটার অভ্যাস করা, হঠাৎ রাস্তার দিকে দৌড়ে না যাওয়া, এবং গাড়ি দেখলে থেমে দাঁড়ানো।
গবেষণায় প্রমাণিত হয়েছে যে, এই বয়সে শেখানো আচরণগত অভ্যাস দীর্ঘমেয়াদে শিশুর সেফটি বিহেভিয়ারে স্থায়ী প্রভাব ফেলে। তাই খেলার ছলে, গল্পের মাধ্যমে তাদের বোঝান যে রাস্তা একটি বিপজ্জনক জায়গা এবং সবসময় বড়দের সাথে থাকতে হয়। এই বয়সে কালার কোডিং শেখানো শুরু করতে পারেন—যেমন লাল মানে থামো, সবুজ মানে যাও। ছবি, খেলনা গাড়ি এবং মডেল রাস্তা ব্যবহার করে ঘরে বসেই ট্রাফিক গেম খেলাতে পারেন।
৬-৯ বছর বয়স: ট্রাফিক নিয়ম বোঝানোর উপযুক্ত সময়
এই বয়সে এসে শিশুরা কারণ ও ফলাফল বুঝতে শুরু করে। তাই এখন আর শুধু অভ্যাস নয়, বরং নিয়মের পেছনের কারণ ব্যাখ্যা করে শেখানো সম্ভব। এই বয়সে শিশুদের বেসিক ট্রাফিক রুলস শেখানো উচিত—যেমন রেড সিগন্যালে থামতে হয়, গ্রিন সিগন্যালে রাস্তা পার হতে হয়, জেব্রা ক্রসিং ব্যবহার করলে কেন নিরাপদ থাকা যায়, চলন্ত গাড়ির সামনে বা পেছনে দৌড়ানো কেন বিপজ্জনক, এবং বাস বা গাড়ির খুব কাছে দাঁড়িয়ে না থাকা কেন জরুরি।
ইউনিসেফের গবেষণা অনুযায়ী, শিশুরা গল্প এবং বাস্তব উদাহরণের মাধ্যমে শিখলে নিয়ম বেশি মনে রাখতে পারে। তাই তাদের সাথে স্কুলে যাওয়া-আসার পথে রিয়েল-টাইম শিক্ষা দিন। রাস্তা পার হওয়ার সময় বলুন—”দেখো, এখন লাল বাতি জ্বলছে, তাই আমরা দাঁড়িয়ে আছি। এটা আমাদের নিরাপত্তার জন্য।” এই বয়সে তাদের লুক লেফট, লুক রাইট নিয়মটি শেখান—অর্থাৎ রাস্তা পার হওয়ার আগে প্রথমে বাঁদিকে, তারপর ডানদিকে, আবার বাঁদিকে তাকিয়ে নিশ্চিত হতে হয় যে কোনো গাড়ি আসছে না। এছাড়া তাদের পেডেস্ট্রিয়ান সাইন এবং ট্রাফিক সিগন্যাল সম্পর্কে ধারণা দিতে পারেন।
১০-১৩ বছর বয়স: বাস্তব ঝুঁকি ও দায়িত্ববোধ তৈরির পর্যায়
এই বয়সে অনেক শিশুই একা স্কুলে যাওয়া-আসা শুরু করে। তাই এখন তাদের সেলফ-রেসপন্সিবিলিটি এবং ইনডিপেন্ডেন্ট সেফটি শেখানো অত্যন্ত জরুরি। এই বয়সে শিশুদের বলুন যে, বাসে ওঠার সময় ধাক্কাধাক্কি না করতে, বাস বা গাড়ি থেকে নামার আগে ভালোভাবে চারপাশ দেখে নিতে, এবং রাস্তায় হাঁটার সময় মোবাইল বা হেডফোন ব্যবহার না করতে। বিশেষত বর্তমান যুগে যখন বেশিরভাগ শিশুর হাতে স্মার্টফোন থাকে, তখন ডিস্ট্র্যাকটেড ওয়াকিং একটি বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এই বয়সে শিশুদের সাইকেল সেফটি এবং হেলমেট ব্যবহারের গুরুত্ব বোঝাতে হবে। যদি তারা সাইকেল চালায়, তাহলে তাদের শেখান যে সাইকেল চালানোর সময় সবসময় রোডের বাম পাশে থাকতে হয়, হাত দিয়ে টার্ন সিগন্যাল দিতে হয়, এবং রাতে অবশ্যই লাইট ও রিফ্লেক্টর ব্যবহার করতে হয়। এছাড়াও তাদের বলুন যে, ব্লাইন্ড স্পট কী এবং কেন বড় ট্রাক বা বাসের পাশে খুব কাছে গেলে বিপদ হতে পারে।
গাড়ি বা বাস থেকে নামার সময় একটি জীবন রক্ষাকারী নিয়ম
এই টিপসটি অনেকেই জানেন না, কিন্তু এটি অত্যন্ত কার্যকর। শিশুদের অবশ্যই শেখাতে হবে—গাড়ি বা বাস থেকে নামার সময় প্রথমে বাম পা দিয়ে নামতে হয়। কারণ বাম পা আগে নামালে শরীরের ব্যালান্স ঠিক থাকে এবং নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখা সহজ হয়। ডান পাশ দিয়ে তাড়াহুড়া করে নামলে শরীর বাঁকা হয়ে যায় এবং চলন্ত যানবাহনের ধাক্কা লাগার ঝুঁকি বেড়ে যায়। বাস বা গাড়ি থেকে নামার সময় কখনোই তাড়াহুড়া করা উচিত নয়—প্রথমে পুরোপুরি থেমে যাক, তারপর আশেপাশে কোনো মোটরসাইকেল বা রিকশা আসছে কিনা দেখে নিতে হবে।
এই ছোট্ট নিয়মটি অনেক বড় রোড অ্যাক্সিডেন্ট এড়াতে সাহায্য করতে পারে। বিশেষ করে স্কুল বাস থেকে নামার সময় শিশুরা প্রায়ই ছুটে নেমে রাস্তায় দৌড়ে যায়, যা অত্যন্ত বিপজ্জনক। তাদের শেখান যে, বাস থেকে নেমে অন্তত ৩-৪ পা দূরে দাঁড়াতে হবে, তারপর ভালো করে দেখে রাস্তা পার হতে হবে।
কখন এবং কীভাবে শেখাবেন—সেরা কৌশল
রাস্তার নিয়ম শেখানোর সবচেয়ে কার্যকর পদ্ধতি হলো রিয়েল-লাইফ প্র্যাকটিস। বই পড়ে বা ঘরে বসে শেখানোর চেয়ে বাস্তব রাস্তায় শেখানো অনেক বেশি কার্যকর। যখন আপনি স্কুলে যাওয়া-আসার পথে, বাজারে যাওয়ার সময়, বা বাস-রিকশায় চড়ার সময় থাকবেন—ঠিক তখনই লাইভ এক্সাম্পল দিয়ে বোঝান। যেমন, রাস্তা পার হওয়ার আগে বলুন—”দেখো, এখন আমরা জেব্রা ক্রসিং ব্যবহার করছি। এটা নিরাপদ।” বা “ওই গাড়িটা খুব জোরে আসছে, তাই আমরা থেমে আছি।”
শিশুদের শুধু ভয় দেখানো নয়, বরং কেন এই নিয়ম মানা দরকার—সেটা যুক্তি দিয়ে বোঝানো উচিত। যেমন, “হেডফোন লাগিয়ে রাস্তায় হাঁটলে তুমি গাড়ির হর্ন শুনতে পাবে না, তাই বিপদ হতে পারে।” এভাবে কারণসহ বোঝালে শিশুরা নিয়ম মনে রাখে এবং নিজে থেকে মেনে চলার চেষ্টা করে। এছাড়াও রোল প্লে বা সিমুলেশন গেম খেলাতে পারেন—যেমন ঘরে ছোট রাস্তা বানিয়ে খেলনা গাড়ি দিয়ে ট্রাফিক সিচুয়েশন তৈরি করুন এবং শিশুকে দেখান কীভাবে সঠিকভাবে রাস্তা পার হতে হয়।
অভিভাবকের আচরণই সবচেয়ে বড় শিক্ষা
রাস্তার নিয়ম শেখানোর ক্ষেত্রেও এটি প্রযোজ্য। আপনার নিজের রোড ডিসিপ্লিন এবং আচরণই আপনার শিশুর জন্য সবচেয়ে বড় শিক্ষা। যদি আপনি নিজেই লাল বাতি অমান্য করেন, ফুটপাত না মেনে রাস্তায় হাঁটেন, বা রাস্তা পার হওয়ার সময় ফোন ব্যবহার করেন—তাহলে আপনার শিশুও সেটাই শিখবে।
গবেষণা বলছে, শিশুরা উপদেশের চেয়ে অনুকরণ থেকেই বেশি শেখে। তাই আপনি নিজে সবসময় জেব্রা ক্রসিং ব্যবহার করুন, ট্রাফিক লাইট মানুন, এবং নিরাপদভাবে রাস্তা পার হোন। আপনার সচেতন আচরণই আপনার সন্তানের জন্য সবচেয়ে বড় উদাহরণ। এছাড়াও পরিবারের অন্য সদস্য—দাদা-দাদি, চাচা-চাচি সবাইকেও এ বিষয়ে সচেতন করুন, কারণ শিশু তাদের কাছ থেকেও শেখে।
বয়স অনুযায়ী রাস্তার নিয়ম—টেবিল আকারে সংক্ষিপ্ত তথ্য
| বয়স | শিক্ষার মূল বিষয় | গুরুত্বপূর্ণ টিপস |
|---|---|---|
| ৩-৫ বছর | অভিভাবকের হাত ধরে হাঁটা, ফুটপাত ব্যবহার, হঠাৎ দৌড়ানো থেকে বিরত থাকা | গল্প ও খেলার মাধ্যমে শেখান, কালার কোডিং (লাল-সবুজ) শেখান |
| ৬-৯ বছর | ট্রাফিক সিগন্যাল মানা, জেব্রা ক্রসিং ব্যবহার, লুক লেফট-রাইট নিয়ম | বাস্তব উদাহরণ দিয়ে শেখান, স্কুলে যাওয়ার পথে প্র্যাকটিস করান |
| ১০-১৩ বছর | একা রাস্তা পার হওয়া, বাস থেকে নামা, সাইকেল সেফটি, মোবাইল ব্যবহার না করা | দায়িত্ববোধ তৈরি করুন, ব্লাইন্ড স্পট সম্পর্কে ধারণা দিন, বাম পা দিয়ে নামা শেখান |
রোড সেফটি সংস্থা ও সংগঠনের ভূমিকা
বিশ্বব্যাপী বিভিন্ন সংস্থা শিশুদের রোড সেফটি নিয়ে কাজ করছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) প্রতি বছর সড়ক দুর্ঘটনা সংক্রান্ত রিপোর্ট প্রকাশ করে এবং বিভিন্ন দেশকে রোড সেফটি পলিসি উন্নত করতে সহায়তা করে। ইউনিসেফ (UNICEF) শিশুদের জন্য ট্রাফিক এডুকেশন প্রোগ্রাম পরিচালনা করে এবং স্কুলভিত্তিক সচেতনতা বৃদ্ধি করে। এছাড়াও গ্লোবাল রোড সেফটি পার্টনারশিপ এবং বাংলাদেশের জাতীয় সড়ক নিরাপত্তা কাউন্সিল শিশুদের রাস্তার নিয়ম শেখানোর জন্য বিভিন্ন ক্যাম্পেইন এবং প্রশিক্ষণ কর্মসূচি পরিচালনা করছে।
এই সংস্থাগুলো শুধু নীতি তৈরিই করে না, বরং স্কুল, কমিউনিটি এবং পরিবারের সাথে মিলে প্র্যাকটিক্যাল ট্রেনিং দেয়। অনেক স্কুলে এখন রোড সেফটি ক্লাস বাধ্যতামূলক করা হচ্ছে, যেখানে ছবি, ভিডিও এবং সিমুলেশনের মাধ্যমে শিশুদের শেখানো হয়। যদি আপনার সন্তানের স্কুলে এমন কোনো প্রোগ্রাম না থাকে, তাহলে স্কুল কর্তৃপক্ষকে অনুরোধ করুন এটি চালু করতে।
প্রযুক্তি ও অ্যাপ্লিকেশনের সাহায্য
বর্তমান যুগে টেকনোলজি শিশুদের রাস্তার নিয়ম শেখাতে বড় ভূমিকা রাখছে। বিভিন্ন এডুকেশনাল অ্যাপস এবং গেম আছে যা মজার মাধ্যমে ট্রাফিক রুলস শেখায়। যেমন, “Road Safety Learning”, “Traffic Safety for Kids”, এবং “Safe Kids Games” জাতীয় অ্যাপগুলো শিশুদের ইন্টারঅ্যাক্টিভ গেমের মাধ্যমে শেখায় কীভাবে নিরাপদে রাস্তা পার হতে হয়, ট্রাফিক লাইট কী বোঝায়, এবং কোন পরিস্থিতিতে কী করতে হয়।
এছাড়াও ইউটিউবে অনেক এনিমেটেড ভিডিও আছে যা শিশুদের জন্য বিশেষভাবে তৈরি এবং সহজ ভাষায় ট্রাফিক রুলস ব্যাখ্যা করে। আপনি চাইলে আপনার সন্তানকে সপ্তাহে এক-দুইবার এমন ভিডিও দেখাতে পারেন। তবে মনে রাখবেন, শুধু ভিডিও বা অ্যাপ নয়—রিয়েল-লাইফ প্র্যাকটিসই সবচেয়ে জরুরি।
রাস্তার নিয়ম শেখানোর সময় যে ভুলগুলো এড়াতে হবে
অনেক অভিভাবক ভালো উদ্দেশ্যে শিশুদের রাস্তার নিয়ম শেখালেও কিছু সাধারণ ভুল করে ফেলেন। প্রথমত, শুধু ভয় দেখানো—যেমন “রাস্তায় গেলে গাড়ি চাপা পড়বে!”—এই ধরনের কথা শিশুকে ভীত করে তোলে কিন্তু সঠিক জ্ঞান দেয় না। দ্বিতীয়ত, নিজে নিয়ম না মেনে শিশুকে শেখানো—এটি ডাবল স্ট্যান্ডার্ড তৈরি করে এবং শিশু বিভ্রান্ত হয়। তৃতীয়ত, একবার শেখালেই ভুলে যাওয়া—রাস্তার নিয়ম শেখানো একটি চলমান প্রক্রিয়া, বারবার মনে করিয়ে দিতে হয়। চতুর্থত, বয়স অনুযায়ী শেখানো না—৫ বছরের শিশুকে যা শেখাবেন, ১০ বছরের শিশুকে তা শেখালে কাজ হবে না।
এই ভুলগুলো এড়িয়ে যদি সচেতনভাবে, ধৈর্য সহকারে, এবং ধারাবাহিকভাবে শেখান—তাহলে আপনার সন্তান নিশ্চিতভাবে রোড সেফ হয়ে উঠবে।
পরিবার ও স্কুলের যৌথ দায়িত্ব
শিশুদের রাস্তার নিয়ম শেখানো শুধু পরিবারের দায়িত্ব নয়, স্কুলেরও সমান দায়িত্ব রয়েছে। স্কুল কর্তৃপক্ষ যদি নিয়মিত রোড সেফটি ওয়ার্কশপ, মক ড্রিল, এবং অ্যাওয়ারনেস প্রোগ্রাম আয়োজন করে, তাহলে শিশুরা আরও ভালোভাবে শিখতে পারে। অনেক স্কুলে এখন রোড সেফটি ক্লাব গঠন করা হচ্ছে, যেখানে শিশুরা নিজেরাই নিজেদের মধ্যে সচেতনতা ছড়ায়।
পরিবার এবং স্কুল যদি একসাথে কাজ করে, তাহলে শিশুরা দুই জায়গা থেকেই একই বার্তা পাবে এবং তা বেশি কার্যকর হবে। তাই আপনার সন্তানের স্কুলের সাথে যোগাযোগ রাখুন, তাদের রোড সেফটি পলিসি জানুন, এবং প্রয়োজনে নিজেও সহযোগিতা করুন। অনেক স্কুল প্যারেন্ট ভলান্টিয়ার নিয়ে থাকে যারা স্কুল ছুটির সময় শিশুদের রাস্তা পার করতে সাহায্য করে—এটি একটি চমৎকার উদ্যোগ।
শেষ কথা: সচেতনতাই সুরক্ষার প্রথম ধাপ
রাস্তার নিয়ম শেখানো কোনো একদিনের কাজ নয়—এটি একটি ধারাবাহিক শিক্ষা এবং আজীবন অভ্যাস। ছোটবেলা থেকেই যদি সঠিক সচেতনতা তৈরি করা যায়, তাহলে ভবিষ্যতে সড়ক দুর্ঘটনার ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব। আজ আপনি আপনার সন্তানকে যেভাবে রাস্তা চলতে শেখাবেন, সেটিই আগামী দিনের নিরাপদ নাগরিক গড়ে তোলার ভিত্তি। মনে রাখবেন, শিশুরা শুধু শুনে নয়, দেখে এবং অনুসরণ করে শেখে। তাই আপনার নিজের আচরণই হোক তাদের জন্য সবচেয়ে বড় উদাহরণ।
আজই শুরু করুন—আপনার সন্তানকে একটি সেফ রোড ইউজার হিসেবে গড়ে তুলুন। প্রতিটি ছোট পদক্ষেপ, প্রতিটি শেখানো নিয়ম—একদিন তার জীবন বাঁচাতে পারে। রাস্তার নিয়ম মানা শুধু আইনের বিষয় নয়, এটি জীবন রক্ষার বিষয়।
FAQ – প্রায়শই জিজ্ঞাসিত প্রশ্নাবলী
১. শিশুকে কত বছর বয়স থেকে রাস্তার নিয়ম শেখানো শুরু করা উচিত?
শিশুকে ৩ বছর বয়স থেকেই বেসিক রোড সেফটি শেখানো শুরু করা উচিত। এই বয়সে তারা অভিভাবকের হাত ধরে হাঁটা, ফুটপাত ব্যবহার করা এবং হঠাৎ দৌড়ানো থেকে বিরত থাকার মতো মৌলিক অভ্যাস শিখতে পারে। যত আগে শুরু করবেন, শিশু তত স্বাভাবিকভাবে এটি গ্রহণ করবে।
২. জেব্রা ক্রসিং কী এবং কেন এটি শিশুদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ?
জেব্রা ক্রসিং হলো রাস্তায় আঁকা সাদা-কালো ডোরাকাটা দাগ যা পথচারীদের রাস্তা পার হওয়ার জন্য নির্ধারিত স্থান। এটি শিশুদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ কারণ এই স্থানে গাড়িচালকরা গতি কমায় এবং পথচারীদের অগ্রাধিকার দেয়। শিশুদের শেখান যে সবসময় জেব্রা ক্রসিং ব্যবহার করে রাস্তা পার হতে হয়।
৩. শিশু যদি একা স্কুলে যায়, তাহলে কী বিশেষ সতর্কতা নেওয়া উচিত?
শিশু একা স্কুলে গেলে নিশ্চিত করুন যে সে ট্রাফিক সিগন্যাল মানে, জেব্রা ক্রসিং ব্যবহার করে, রাস্তায় হাঁটার সময় মোবাইল বা হেডফোন ব্যবহার না করে, এবং চলন্ত গাড়ির কাছে না যায়। প্রথম কয়েকবার তার সাথে যান এবং পুরো রাস্তা দেখিয়ে দিন। এছাড়া তাকে বাস থেকে বাম পা দিয়ে নামা শেখান।
৪. রাস্তায় হাঁটার সময় শিশুদের কোন দিকে হাঁটা উচিত?
শিশুদের সবসময় রাস্তার বাম পাশে হাঁটা উচিত, যাতে তারা সামনে থেকে আসা গাড়ি দেখতে পায়। যদি ফুটপাত থাকে, তাহলে অবশ্যই ফুটপাত ব্যবহার করতে হবে। ফুটপাত না থাকলে রাস্তার একদম পাশে, দেয়ালের কাছে হাঁটতে হবে।
৫. সাইকেল চালানোর সময় শিশুদের কী কী নিরাপত্তা নিয়ম মানা উচিত?
সাইকেল চালানোর সময় শিশুদের অবশ্যই হেলমেট পরতে হবে, রাস্তার বাম পাশে চলতে হবে, হাত দিয়ে টার্ন সিগন্যাল দিতে হবে, এবং রাতে লাইট ও রিফ্লেক্টর ব্যবহার করতে হবে। বড় গাড়ির খুব কাছে গেলে বিপদ হতে পারে, তাই দূরত্ব বজায় রাখতে হবে।
৬. শিশু যদি রাস্তার নিয়ম মানতে না চায়, তাহলে কী করবেন?
শিশুকে ভয় না দেখিয়ে যুক্তি দিয়ে বোঝান কেন নিয়ম মানা জরুরি। বাস্তব উদাহরণ দেখান, ভিডিও দেখান, এবং রোল প্লে করান। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ—আপনি নিজে নিয়ম মেনে চলুন, কারণ শিশুরা অনুকরণ করে শেখে। ধৈর্য ধরুন এবং বারবার মনে করিয়ে দিন।
৭. বাস বা গাড়ি থেকে নামার সময় বাম পা দিয়ে নামা কেন জরুরি?
বাম পা দিয়ে নামলে শরীরের ব্যালান্স ভালো থাকে এবং নিয়ন্ত্রণ সহজ হয়। ডান দিক দিয়ে তাড়াহুড়া করে নামলে শরীর বাঁকা হয়ে যায় এবং পড়ে যাওয়ার বা চলন্ত যানবাহনের ধাক্কা লাগার ঝুঁকি বাড়ে। এটি একটি ছোট কিন্তু জীবন রক্ষাকারী টিপস।
৮. শিশুদের জন্য কোন রোড সেফটি অ্যাপস বা গেমস আছে?
হ্যাঁ, বর্তমানে অনেক এডুকেশনাল অ্যাপস আছে যেমন “Road Safety Learning”, “Traffic Safety for Kids”, এবং “Safe Kids Games”। এগুলো ইন্টারঅ্যাক্টিভ গেমের মাধ্যমে শিশুদের ট্রাফিক রুলস শেখায়। তবে মনে রাখবেন, শুধু অ্যাপ নয়—বাস্তব জীবনে প্র্যাকটিসই সবচেয়ে জরুরি।
